


খবরে প্রকাশ গত ১৯ ডিসেম্বর সোমবার রাজধানী গুলশানের হোটেল ওয়েষ্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ২৭টি রূপরেখার বিস্তারিত তুলে ধরেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালী যুক্ত ছিলেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ক্ষমতায় গেলে বিএনপি রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ২৭টি রূপরেখা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যে সংবিধানের উপর ভিত্তি করে দেশ চলে আসছে, আজ স্বাধীনতার ৫১ বছর পর হঠাৎ করে দেশের রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত করতে কেন বিএপি’র নেতাদের মাথায় তা ঢুকলো এ নিয়ে দেশ বিদেশে সাধারণ মানুষের কাছে এক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, বিএনপি তো তিনবার দেশ শাসন করেছে, সে সময়তো কোন কিছু মেরামতের প্রয়োজন হলে তারা সংসদে আলোচনা করতে পারতেন, কিন্তু সে সময়তো তা তারা করেন নি? এমন কি প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব ওতো দেশ শাসন করেছেন, তিনিওতো তা করেননি। অনেকেই আবার বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কিন্তু তাদের নয়, এ সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তাদের গুরু জামায়াত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী দেশী বিদেশী চক্রান্তকারীদের!
বিএনপি’র অনেক নেতা-ই এই ২৭ দফার অনেক দফা নিয়েই মুখ খুলতে শুরু করেছেন যা তারা মেনে নিতে পারছেন না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপি নেতৃবৃন্দ তাদের দলের মতামত না নিয়ে নিজেরাই তাদের প্রভুদের বুদ্ধিতেই, তাদের খুশী রাখার জন্য এ কাজটি করছেন। এর ফল যে হিতে বিপরীত হতে পারে তা কি তারা ভেবে দেখছেন?
যাই হোক, বিএনপি’র ঘোষিত ২৭ দফার কয়েকটি নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
১ নং একটি “সংবিধান সংস্কার কমিশন’ গঠন করে বর্তমান সরকার গৃহীত সব অযৌক্তিক, বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও পরিবর্তন রহিত/ সংশোধন করা হবে।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ’সংবিধান সংস্কার কমিশন’ কি সংস্কার করবে? দেশের মানুষের যা যা দরকার সরকার তা করে যাচ্ছে। দেশের জনগণ তাদের পূর্ণ গণতানিন্ত্রক অধিকার এবং জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে দেশে বসবাস করছে। প্রয়োজনে সরকার গরীব অসহায়দের ঘরবাড়ি তৈরী করে দেয়া সহ তাদের ভরণ পোষনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, প্রতিটি এলাকায় স্কুল কলেজ মাদ্রাসা নির্মাণ করে লেখাপড়ার সুযোগ সুবিধা করে দিচ্ছে, যা জনগণের দাবি। রাস্তাঘাট সেতু নির্মাাণ করে দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করছে। জনগণ এখন শান্তিতেই দেশে বসবাস করছে।
এছাড়াও দেশের জঙ্গী গোষ্ঠীকে দমন করার জন্য আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে তাদের কারণে দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থায় ব্যাঘাত না ঘটে, জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি না হয়। অনেক রাজনৈতিক দলের নেতারা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছে, তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এদের ফিরিয়ে আনলে আ্ইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যা করা কর্তব্য বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তা করে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলো নির্দ্ধিধায় তাদের মিছিল মিটিং করে যাচ্ছে। এর মধ্যে যারা বিশৃঙ্খলা সষ্টি করে জনগণের জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আ্ইনের আওতায় নিয়ে আসছে। অর্থাৎ তারা স্বাধীন ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন।
সুতরাং এখানে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের কোন দরকার আছে বলে মনে করি না। তবে কোন দলের পলাতক সাঁজাপ্রাপ্ত আসামী থাকলে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সংবিধানে আইন সংস্কার, সংশোধন/রহিত ইত্যাদি করা যেতে পারে। তবে তা জনগণের স্বর্থে নয়, দলের স্বার্থে। এখানে বিএনপি’র উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের নেতাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনে আইন সংস্কার, সংশোধন/রহিত করবে।
২ নং – প্রতিহিংসা প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক ”রেইনবো-নেশন’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এজন্য একটি ’জাতীয় সমঝোতা কমিশন ’ গঠন করা হবে।
বিএনপি’র নীতিনির্ধারক নেতারা ’রেইনবো নেশন’ এর অর্থ কি আমার মনে হয় তা-ই তারা বুঝেন না। এই উক্তিটি একজন বিএনপি’র সমর্থকের। তিনি বলেছেন, যে দল ’বিছমিল্লাহ’ এবং ’আল্লাহর উপর বিশ্বাস’ রেখে সবচেয়ে বড় দল হলো, সেই দল আজ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অভিশপ্ত পথ বেছে নিলো!
বিবিসি বাংলার এক খবরে পড়লাম, বর্তমান বিশ্বে ট্রান্সজেন্ডার এবং সমকামী অধিকার আন্দোলনে ’রেইনবো’ শব্দটি জনপ্রিয়। কিন্তু ’রেইনবো নেশন’ বলতে বিএনপি কি বোঝাচ্ছে?
এব্যাপারে বিএনপি’র স্থায়ী কমিট্রি সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আপনি সবই কিন্তু একেবারে করতে পারবেন এমন কোন কথা নাই। চেষ্টা করার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করাও একটা ব্যপার আছে। বাংলাদেশে যে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অবস্থান মানুষের চিন্তা চেতনা সেটাকে মাথায় রাখতে হবে। ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি গণতন্ত্র যখন বলেন তখনতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের গুরুত্ব দেয়াটা হচ্ছে গণতন্ত্র। তা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সমকামীদের অধিকার যেটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে সেটা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত কী?
এ বছরের জুন মাসে সৌদী আরবে সমকামীদের প্রতীক রঙধনু, তাই রংধনু রঙের সবকিছু জব্দ করেছে সৌদী আরব। ভাবতেও অবাক লাগে , যে সৌদি আরব গিয়ে গাছ (সম্ভব: নিম গাছ} লাগিয়ে সৌদির বাহবা পেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আজ তার দল বিএনপি ’বিসমিল্লাহ’ শব্দটিকে ভুলুন্ঠিত করে তারা চায় বাঙালী সমাজকে ’সমকামী জাতি’ বা রেইনবো নেশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে! বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ এখনও বেঁচে আছে। সাবধান! তবে আমার মনে হয়, বিএনপি বরং তাদের দলের নাম বদল করে নতুন নামে ”বিএনপি -রেইনবো পার্টি’ নামে আখ্যায়িত করে তাদের দলকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তোলার চেষ্টা করতে পারে।
৩ নং- একটি ’নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
২০০১ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি জামায়াতের সাথে মিলে জোট সরকার নিয়ে মন্ত্রী সভা গঠন করে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই তারা হাওয়া ভবনকে একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে। দুর্নীতি, লুটপাট, হত্যা, গুম ইত্যাদির কারণে তারা জনগণের আস্থা হারাতে থাকে। এ সময় এই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার স্বার্থে বিএনপি জোট সরকার একটি নীল নকশা তৈরী করে এবং এই নীলনকশার মাধ্যমেই ইয়াজ উদ্দিন আহমেদকে তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়। সে সময় তার তত্তাবধানেই একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। এরপর ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসে ওয়ান ইলেভেনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয়। সে সময় শেখ হাসিনা এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু প্রায় দু’বছর সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করার পর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপে তাদের নির্বাচন দিতে বাধ্য করা হয়। সেই নির্বাচনে তিন চতুর্থাংশেরও বেশি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ মহাজোট বিজয় লাভ করে।
বিএনপি’র হাতে গড়া তত্বাবধায়ক সরকারের দেয়া নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের কাছে বেঈজ্জতিভাবে হেরেও বারবার কেন তারা তত্বাবধায়ক সরকারের জন্য এত কান্নাকাটি করছে? তত্বাবধায়ক সরকার অথবা যে কোন সরকারই হোক না কেন, নিজের দলের প্রতি যদি জনগণের সমর্থন না থাকে তাহলে ক্ষমতায় যাওয়া কোন দিনও সম্ভব নয়। সংবিধানে রদবদল এনেও ফায়দা হবে না, নেতাদের সেটা বুঝা উচিৎ।
৫ নং- পরপর দুইবারের অতিরিক্ত কেউ রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এই দফার উপর বিএনপি’র অনেক নেতা এবং তাদের কর্মীরা সমর্থন করেন না। তারা হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়ার অনুসারী। তাদের মতে ’বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও তাদের প্রিয় নেত্রী ক্ষমতায় আসতে পারবেন না, যদি বিএনপি কোনদিন ক্ষমতায় আসে আর খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রীত্বের আসন না দেয়া হয় তাহলে বিএনপি দু’ভাবে বিভক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং এব্যাপারে আমাদের নেতাদের চিন্তা করা উচিৎ।’ তাহলে বুঝা যায়, বিএনপি দু’ভাগে বিভক্ত। একদিকে হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়ার দল আর অন্যদিকে জনাব তারেক রহমানে দল। এই দফা বাস্তবায়নের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দলকে দু’ভাগে বিভক্ত করা বলে অনেকেরই অভিমত।
দফা ১৩- দুর্নীতির ক্ষেত্রে আপোষ করা হবে না। অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী ’ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা হবে।
আমার মনে হয়, খন্দকার মোশাররফ হোসেন ভুলে গেছেন তাদের রাজত্বের সময় ’হাওয়া ভবনের’ ভেতরের সকল কুকীর্তির কথা । যদিও তা দেশবাসীর আদ্যোপান্ত জানা, তবুও সংক্ষেপে বলবো, যদি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সেই হাওয়া ভবনের সব দুর্নীতির কল্পকাহিনী শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করে, তাহলে বাংলাদেশের মাটিতে বিএনপি’কে আর রাজনীতি করতে হবে না। আমাদের দেশে একটা কথা আছে ”চোরের বউয়ের বড় গলা”।
এই ২৭ দফায় বিএনপি দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করার মতো নতুনত্ব কিছুই দিতে পারেনি বরং এই ২৭টি দফা পর্য্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের শাসনামলে যেগুলোতে তারা বেশি মার খেয়েছে সে ধারাগুলোতে রদবদল আনতে চায়। এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে মাত্র কয়েকটি দফার আলোচনা করলাম।
তাই বিএনপি নেতাদের বলবো, রাষ্ট্র মেরামতের চিন্তা না করে বরং নিজেদের দলকে মেরামতের চিন্তা করাটাই উত্তম হবে।
লেখকঃ দেওয়ান রফিকুল হায়দার (ফয়ছল), কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব।