শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন

ওয়েলসবাসীর ভালোবাসায় রাইট অনারেবল রডরি মর্গানের ভাস্কর্য উদ্বোধিত

ওয়েলস সংবাদদাতা
  • খবর আপডেট সময় : শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫ এই পর্যন্ত দেখেছেন

সাউথওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফের কাডিফ’বে সেনেড হাউস এবং পিয়ারহেড বিল্ডিং-এর সামনে উদ্বোধন করা হয়েছে ফাদার অব ডিভোলিউশন’ ওয়েলসের প্রথম রাইট অনারেবল ফার্স্ট মিনিষ্টার রডরি মর্গানের সম্মানে তার ঐতিহাসিক ভাস্কর্য।

উল্লেখ্য রডরি মর্গান ১০ বছর ওয়েলসের ফার্ষ্ট মিনিষ্টার হিসেবে সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় দ্বায়িত্ব পালন করেন। লেবার পার্টির একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ফার্ষ্ট মিনিষ্টার অব ওয়েলস এবং লিডার অব ওয়েলস হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন কেেরন ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। এছাড়াও তিনি কার্ডিফ ওয়েষ্ট-এ এসেম্বলি মেম্বার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্য্যন্ত এবং কার্ডিফ ওয়েষ্ট এর মেম্বার অব পার্লামেন্ট হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। তিনি ৭৭ বছর বয়সে ২০১৭ সালের ১৭ই মে শেষ নি:শ্বাাস ত্যাগ করেন।

ওয়েলসবাসীর কাছে তিনি ছিলেন সুখে দু:খের আপনজন। তাঁর চলাফেরা ছিলো অতি সাধারণ মানুষের মতো। তিনি ওয়েলসের বিভিন্ন জয়গা ঘুরে বেড়াতেন, ছোট বড় বিভিন্ন ধরণের ফার্মের মালিকদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নিতেন, ফার্মকে কিভাবে আরও উন্নতমানের করা যায়, কিভাবে তাদের অসুবিধাগুলো দূর করা যায় এ ধরণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের সথে আলাপ আলোচনা করতেন। এরপর তিনি অফিসে এসে কেবিনেট মেম্বারদের সাথে আলাপ করে ফার্মগুলোর মালিদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে কি ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতেন এবং পরে তা বস্তবায়ন করতেন। এ ভাবেই তিনি ওয়েলসকে একটি মডার্ণ ওয়েলস-এ পরিণত করার ব্রত নিয়েই কাজ করে যান আজীবন আর এ জন্যই তাঁকে ওয়েলসবাসীর পক্ষ থেকে ”ফাদার অব ডিভোলিউশন” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

রাইট অনারেবল রডরি মর্গান ওয়েলবাসীর জন্য নি:স্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়র স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে একটি ভাস্কর্য (স্ট্যাচু) নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশী কাউন্সিলার দিলওয়ার আলী হচ্ছেন এই ভাস্কর্য (স্ট্যাচু) নির্মাণের পরিকল্পকারী। তিনিই প্রথম উদ্যোগ নেন এই ভাস্কর্য (স্ট্যাচু) নির্মণের। তাঁর উদ্যোগেই রডরি পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং কমিউনিটি নেতৃন্দদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে সর্বসম্মতিক্রমে অফিসিয়্যালি ”রডরি মর্গান স্ট্যাচু ফান্ড” গঠন করা হয়। এই ফান্ডের প্রথম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ’দি সেনেড’-এ ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে।। রডরি মর্গান স্ট্যাচু কমিটির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর এবং ট্রাষ্টি কাউন্সিলর দিওয়ার আলী জানিয়েছেন, এই স্ট্যাচু নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ১৩২ হাজার পাউন্ড। এই ফান্ডে যারা সাহায্য করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন আমাদের কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ সহ ব্যবসায়ী এবং ওয়েলস ইউনিভাার্সিটি। যারা ফান্ড গঠনে সাহায্য প্রদান করেছেন রডরি মর্গানের স্ত্রী জুলি মর্গান এবং প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর কাউন্সিলার দিলওয়ার আলী সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জনিয়েছেন।

ওয়েলসবাসীর বহুদিনের আকাঙ্খিত ব্রোঞ্জের তৈরী ঐতিহাসিক ’রডরি মর্গান স্ট্যাচুটি’ বর্ণাঢ্য আয়োজনে গত ৯ই জুলাই ওয়েলস কার্ডিফ বে’র সেনেড (পার্লামেন্ট ভবন) ও পিয়ারহেড বিল্ডিংয়ের মাঝামাঝি স্থানে স্থাপিত হয়।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ওয়েলস পার্লামেন্টের ডেপুটি ফার্ষ্ট মিনিষ্টার সিওনেড উনলিয়ামস এম এস, সাবেক ফার্ষ্ট মিনিষ্টার মার্ক ডেরেকফোর্ড, ফাইন্যান্স মিনিষ্টার এলিন জোন্স, মর্গানের স্ত্রী জুলি মর্গান, সিনেড মেম্বার হিউ টমান, লেবার এর এম এস শাভ, ল্লুইড হিউ ইরাঙ্কা ডেভিস, কার্ডিফের লর্ড মেযর রাইট অনারেবল মাইকেল মাইকেল ও রডরি মর্গান ট্রাষ্টের অন্যতম ফাউন্ডার্স কো-অর্ডিনেটর কাউন্সিলার দিলওয়ার আলী।

অনুষ্ঠানসূচীর মধ্যে ছিলো সকাল ১১ থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পিয়ারহেড বিল্ডিংয়ে অতিথিদের স্বাগতম জানানো হয়। সেখানে ছিল চা, কফি এবং পানির ব্যাবস্থা। এ ছাড়াও ছিল ১১টা থেকে সাড়ে ১১ পর্যন্ত পিয়ারহেডের ভেতরে এবং বাইরে স্ট্যাচুর সামনে মিউজিক এবং ভারতীয় ড্যান্স, ১১টা ৫৫ মিনিটে জেন হাটের পরিচালনায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর স্ট্যাচুর সামনে ভারতীয় নৃত্য শিল্পী ছোট্ট মেয়ে ভার্নিকা ধিরাজ (সমর্পন) এর মাতা পবিত্র ক্রিসনান এর পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করে সবার প্রশংসা অর্জন করে। দৃপুর ১২টায় জেন হাট স্পনসরদের পরিচয় করিয়ে দেন। ১২টা ০৩ মিনিটে স্পনসরদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জো ইরাঙ্কা ডেভিস, রাইট অনারেবল এনির জোনস, শাবানাহ তাজ, ১২টা ১৫মি. মাউন্ট স্টুয়ার্ট প্রাইমারী স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা গায় ’সামথিং ইনসাইড সো স্ট্রং’ গানটি, এরপর স্ট্রাচু নির্মাতা এনিডি এডওয়ার্ডকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। ১২টা ২০ মি. জুলি মর্গান এবং তাদের পরিবারের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের নাতিদের দ্বারা স্ট্যাচুর পর্দা সরিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে রডরি মর্গান- প্রেমি ওয়েলস সহ বিভিন্ন শহর থেকে আগত শত শত মানুষের উপস্থিতিতে করতালির মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয়।

উদ্বোধনের পর বক্তব্য রাখেন ডেপুটি ফার্স্ট মিনিষ্টার সিওনডে উইলিয়াম এম এস, লর্ড মেয়র অব কার্ডিফ কাউন্সিলার মাইকেল মাইকেল, কাউন্সিলার দিলওয়ার আলী তাঁর বক্তব্য শেষে পরিচয় করিয়ে দেন উনন্ডরাশ এলডার্সদের। এরপর এল্ডার রোমা টেইলর রডরিকে নিয়ে একটি কবিতা আবৃতি করেন।

জুলি মর্গান তার বক্তব্যে বলেন, ভাস্কর্যটি কেন উঁচু মঞ্চে নয় বরং মাটির ওপর স্থাপন করা হয়েছে, তার কারণ হচ্ছে তিনি ছিলেন মানুষের খুব প্রিয় একজন মানুষ। সাবেক ফার্ষ্ট মিনিষ্টার মার্ক ড্রেকফোর্ড একে ’ডেভোলিউশনের জনক’ এর স্থায়ী স্মারক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রডরি মর্গান ছাড়া সেনেড আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারতো না। ওয়েলস পার্লামেন্টের ডেপুটি ফার্ষ্ট মিনিষ্টার সিওনেড উনলিয়ামস বলেন, রডরি মর্গান ওয়েলস ডিভোলিউশনের শুরুর দিকের অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছিলেন। ফাইন্যান্স মিনিষ্টার এলিন জোন্স বলেন, এটি ওয়েলস এবং মর্গান পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। লেবার এম এস শাভ তাজ মর্গানকে শ্রমজীবী মানুষ এবং ট্রেড ইফনিয়ন আন্দোলনের একজন প্রকৃত বন্ধু বলে উল্লেখ করেন। ল্লুইড হিউ -ডেভিস বলেন, ’রডরির সঙ্গে যাদের কখনো দেখা হয়নি , তারাও তাকে যেন একজন বন্ধু হিসেবেই জানতেন।

রডরি মর্গান ট্রাস্টের ফাউন্ডার্স ট্রাষ্টি কাউন্সিলার দিলওয়ার আলী বলেন, তিনি আজ আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন এ জন্য যে, অবশেষে এই ভাস্কর্য নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ছোট ছোট অনুষ্ঠান, ডিনার পার্টি সারা ওয়েলস থেকে আসা অনুদানের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছি, যার মধ্যে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর অবদানও ছিল।

ইউকে বিডিটিভির চেয়ারম্যান ও ওয়েলস বাাংলা নিউজের সম্পাদক মোহাম্মদ মকিস মনসুর বলেন, রডরি মর্গানের সাথে বাংলাদেশী কমিউনিটির ছিল গভীর সম্পর্ক।

ওয়েলস বাংলাদেশ উইমেন্স এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট তাহমিনা খান বলেন, রডরি মর্গান সবার সঙ্গে একই রকম আচরন করতেন। ’তিনি ছিলেন মানবপ্রেমী। তার এই ভাস্কর্য একদিকে যেমন এলাকার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে ঠিক তেমনি রডরি মর্গানের ওয়েলসের মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসার ইতিহাস জানতে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীদের উৎসাহিত করবে।

আমন্ত্রিত অতিথি সাংবাদিক লেখক দেওয়ান ফয়সল বলেন, আমি যখন ’ওয়েলসের কোলে ছোট্ট এক বাংলাদেশ’ বইটি লিখি তখন কাউন্সিলার দিলওয়ার আলী আমাকে রডরি মর্গানের ওপর লেখা ’রডরি- এ পলিটিক্যাল লাইফ ইন ওয়েলস এন্ড ওয়েস্টমিনিষ্টার’ বইটি উপহার দেন। এই বইটি পড়ে তাঁর কর্মজীবনের ইতিহাস পড়ে আমি আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়ি। এই বই থেকে তাঁর কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আমার বইতে একটি চ্যাপ্টার লিখেছি আর ভেবেছি, রডরির মতো একজন সৎ, কর্মট এবং দেশপ্রেমী রাজনীতিবিদ পেয়ে ওয়েলসবাসী ধন্য হয়েছে।

অপেরা শিল্পী এন্থনী স্টুয়ার্ট লয়েড এর পরিচালনায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। বেলা ১টায় উপস্থিত অতিথিবৃন্দকে পিয়ারহেডের ভেতরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। সেখানে হিউ থমাস এম এস (সাবেক লিডার অব কার্ডিফ কাউন্সিল) প্রফেসর উজো আইয়ুবীকে এন্টারটেনমেন্ট পরিচালনার জন্য স্বাগত জানান। উক্ত অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে সানফ্লাওয়ার ওয়েলস ইউক্রেনিয়ান সিংগার গ্রুপ, ড. অস্পরতিা বন্দোপাধ্যয়, মিসেস মানজিৎ সাইনি এবং ড. বুশরা তাজুদিন পরিচালনা করেন কথক স্টেপস। ইফি আইয়ুবী এবং ডক্টর লিন্ডা হামউইম্বার নির্দেশনায় কোরাস গান গিউল তাওই এবং উইন্ডরাশ কামরু।

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102