শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:২৬ অপরাহ্ন

বিশ্ববিদ্যালয়, চুল ও নরসুন্দর

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : রবিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২১
  • ৪৬০ এই পর্যন্ত দেখেছেন

ইউকেবিডি ডেস্ক: চুলদাড়ি কাটা বা ক্ষৌরকর্ম করা যার পেশা, তাদের ক্ষৌরকার বা নাপিত বলা হয়। অভিধানে নাপিতকে নরসুন্দরও বলা হয়। আগে এই নরসুন্দররা ছোট ছোট অস্ত্রোপচার ও দন্ত চিকিৎসার মতো কাজও করতেন। বর্তমানে সেফটি রেজরের উন্নয়নের ফলে নাপিতের কাছে দাড়ি-গোঁফ কামানো কমে এসেছে, তাই সাধারণত নাপিতরা চুলই ছেঁটে থাকেন। অভিধানে নাপিত শব্দটির স্ত্রী লিঙ্গ হিসেবে দেওয়া আছে—নাপিতানি, নাপিতিনি, নাপতিনী। তবে নরসুন্দরের স্ত্রী লিঙ্গ কী, সেটা অভিধানে নেই। এ প্রসঙ্গে আনিসুল হকের একটি কবিতার কথা মনে পড়ে যায় : ‘তারেক মাসুদ একটা সিনেমা বানাইছেন, নরসুন্দর।/ আজকাল বিউটি পারলারে অনেক নারীশ্রমিক উদয়াস্ত শ্রম/ করেন, তাদেরকে কী বলব? মানে নরসুন্দরের স্ত্রীলিঙ্গ কী/ …নারীসুন্দর, নরসুন্দরী, নারীসুন্দরী’—শব্দগুলানের দিকে আমি আড়চোখে তাকাই, আমার লজ্জা লজ্জা লাগে।

নরসুন্দরের কথাটি মনে এলো সম্প্রতি তোলপাড় সৃষ্টি করা একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী প্রক্টর ফারহানা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে ১৪ ছাত্রের চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত গত ২৬ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে তিনি জোর করে কাঁচি দিয়ে ঐ শিক্ষার্থীদের চুল কেটে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় মর্মাহত হয়ে নাজমুল হাসান তুহিন নামের এক শিক্ষার্থী ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এদিকে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ফারহানা ইয়াসমিন বাতেনকে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে। একই সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থগিত করা হয়েছে সব পরীক্ষাও। উল্লিখিত ঘটনাটি নিয়ে শুধু সিরাজগঞ্জ নয়, সারা দেশেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বা লেখাপড়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের চুল-দাড়ি-গোঁফের কী সমপর্ক তা ঠিক বোধগম্য নয়। তবু ফারহানা ইয়াসমিন নামের শিক্ষিকাটি এ ব্যাপারে তত্পর হয়েছেন। তিনি ক্ষুর-কাঁচি নিয়ে নিজেই মাঠে নেমেছেন। জ্ঞান ও শিক্ষার্জনের ইতিহাসে এ এক নতুন মাইলফলক। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ বিভাগের ছাত্ররাও নয়া ইতিহাস গড়েছেন। তারা তাদের আসল কাজ—লেখাপড়া বাদ দিয়ে চুল-দাড়ি নিয়ে মেতেছেন। রবীন্দ্রনাথের চুল বড় ছিল বলেই কি এমন প্রয়াস? রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করতে হলে কেবল চুল রাখলেই কিন্তু হবে না। দাড়িও রাখতে হবে। গোঁফকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত বিভাগের নামটি পরিবর্তন করে ‘চুলের সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাড়ি ছিল, বড়বড় চুল ছিল। রবীন্দ্রনাথের নামের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চুল নিয়ে এমন চুলোচুলি মানা যায় না। ওরা ঠাকুরের মুখে চুনকালি মেখে দিল। এটা একটা ক্ষমাহীন অপরাধ। আসলে দেশে এখন বিদ্যা শিক্ষা, জ্ঞান-বুদ্ধি-মগজ ইত্যাদির তেমন দরকার নেই। এগুলো খুব একটা কাজেও লাগে না। বাঙালির এখন প্রচুর নিষ্ঠাবান পুরুষের দরকার, চুলের দরকার। আর কিছু নিষ্ঠাবান নাপিতেরও দরকার। যারা বিনা মূল্যে চুল কেটে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবেন। স্বেচ্ছায় বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে ফারহানা ইয়াসমিন সত্যিই একটি অনন্য নজির গড়েছেন। এখন তো দেশে স্বেচ্ছায়, বিনা মূল্যে কোনো লাভের আশা না করে কেউ কিছু করে না।

সেক্ষেত্রে ফারহানা ইয়াসমিন যেন নয়া অবতার! স্বেচ্ছায় চুল কেটে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, এ দেশে সবাই সবকিছু এখনো গোল্লায় যায়নি। কিছু মানুষ এখনো আছেন যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার অহমিকা ত্যাগ করে নিজেই ক্ষুর-কাঁচি নিয়ে নরসুন্দরের ভূমিকায় নেমে যান। এটা সত্যিই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এক শিক্ষার্থী নাকি চুলের দুঃখে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন! কেন বাছা, চুলের জন্য তোমার এত দরদ কেন? তোমার শিক্ষিকা নিজ হাতে তোমার চুল কেটে দিয়েছে, এটা তো তোমার জন্য চরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। পৃথিবীতে এমন স্নেহময়ী করিত্কর্মা শিক্ষিকা আর কি কোথাও আছে? তোমার বরং উচিত ছিল, বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজনকেও ঐ শিক্ষিকার কাছে নিয়ে যাওয়া। বিনা মূল্যে সকলের চুল কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা করা। চুল কাটানো শেষ হলে দাড়ি-গোঁফটাও কেটে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা। তা না করে তুমি ঘুমের ওষুধ খেলে? এই তোমার বিদ্যা-শিক্ষাবোধ? তুমি যে ছাত্র নামের কলঙ্ক!

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও আসলে ফারহানা ইয়াসমিনের কাজের গুরুত্ব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। তাই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছেন। আসলে আমাদের দেশে ‘মাথামোটা’ লোকগুলোই প্রশাসনের শীর্ষে বসে থাকে। না হলে কেউ এমন সিদ্ধান্ত নেয়? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত শিগিগর তাকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষার্থীদের ‘চুল-দাড়ি-গোঁফ পরিচর্যা’ বিভাগের প্রধান বানানো।

এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্যোগী হওয়া উচিত। ফারহানা ইয়াসমিন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নতুন ভূমিকা পালনের দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন ভূমিকা পালনের জন্য শিক্ষকদের নিয়োগ করা যেতে পারে। আমাদের দেশে আসলে জ্ঞান-বিদ্যা-শিক্ষা, গবেষণা ইত্যাদি হবে না। এর চাহিদাও নেই, উপযোগিতাও নেই। এসবে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের খুব একটা আগ্রহও নেই। যে জিনিসের চাহিদা নেই, আকর্ষণ নেই সেই জিনিস নিয়ে পড়ে থাকার কোনো মানে নেই। এখন নতুনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঢেলে সাজাবার সময় এসেছে। শিক্ষকদেরও নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ এসেছে। ফারহানা ইয়াসমিন পথ দেখিয়েছেন। এই পথে ধরে এগিয়ে গেলে দেশে আর যা-ই হোক, চুল সমস্যার একটা বড় সমাধান হবে। চুল নিয়ে অনেকেরই অনেক রকম ‘স্পর্শকাতরতা’ আছে। এর কারণও আছে। চুল যে মানুষের শরীরের কত প্রয়োজনীয় একটি অংশ—তা কেবল যার মাথায় চুল নেই, সে-ই জানে। কচ, কুন্তল, কেশ—চুলেরই ভিন্ন ভিন্ন নাম। এই চুল নিয়ে কত কবিতা-গান-সাহিত্য হয়েছে। ঘন কালো চুল সবার নজর কাড়ে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়—‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’। নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা গানের ভাষায় ‘একটা ছিল সোনার কন্যা/ মেঘবরণ কেশ/ ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ’, ‘খায়রুন লো তোর লাম্বা মাথার কেশ/ চিরল দাঁতে হাসি দিয়া পাগল করলি দেশ’ মমতাজের এই গান তো একসময় বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরত।

চুল বা কেশ নিয়ে একটি অবিস্মরণীয় লেখা পড়েছিলাম। লেখাটির অংশবিশেষ উল্লেখ করা যেতে পারে :‘কেশ লইয়া মানবসমাজের এই দুশ্চিন্তা অমূলক নহে, কেশ কেবলমাত্র সৌন্দর্য নহে, পরাভবের ও প্রতীক। প্রাচীনকাল হইতে বর্তমান পর্যন্ত রচিত বিবিধ পুস্তকে কেশের মাহাত্ম্য বিদ্যমান। স্মরণ করিয়ে দেখ, মহাদেব তাহার কেশের জটাজালেই দেবী গঙ্গাকে ধারণ করিয়াছিলেন। বিদেশি উপকথায়ও কেশের মাহাত্ম্য বর্ণিত রহিয়াছে। রাজতনয়া রাপুঞ্জেল তাঁহার কেশের সহায়তায় যে অসাধ্য সাধন করিয়াছিলেন, তাহা সর্বজনবিদিত। বাস্তবের প্রেক্ষাপটেও পরিলক্ষিত হয়, বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানবিদ আইনস্টাইন, কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ, তাঁহাদের কেশসজ্জা তাহাদেরই ন্যায় দুর্লভ। বলা বাহুল্য, বর্তমান মানবসমাজ তাহাদের কেশের (অবশিষ্ট) গুরুত্ব বুঝিয়াছে। এই বোধগম্যতার সূত্র ধরিয়াই বিভিন্ন কেশতৈল ও অন্যান্য কেশসংক্রান্ত প্রসাধন দ্রব্যের উদ্ভব ঘটাইয়া মানবসমাজ তাহাদের দুর্মূল্য সময় ও অমূল্য মস্তিষ্কের ক্ষয়সাধন করিয়া চলিতেছে। তবে বিশেষ আশার কোনো কারণ অবশিষ্ট নাই। পৃথিবী টিকিয়া থাকিলে, বিবর্তনের ধারায় আমাদিগের অবশিষ্ট কেশগুচ্ছও যে কেবলই জাদুঘরের শোভাবর্ধন করিবে, তাহার পূর্বাভাস আমরা প্রাণিতত্ত্ববিদদের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছি।’

ছোটবেলায় আমরা গ্রামে দেখেছি, মাঝে মাঝে ফেরিওয়ালার আগমন ঘটত। ছেঁড়া স্যান্ডেল, জুতা, বোতল ভাঙা, চিমনি ভাঙা, লোহা লক্কর দিয়ে ‘কটকটি’ নামক আজব এক জিনিস খেতাম। এখন সময় বদলেছে। কেশের বিনিময়ে এখন ফেরিওয়ালারা অনেক জায়গায় চুল সংগ্রহ করেন। জিলেপি কিংবা কটকটির বিনিময়ে নয়, নগদ টাকার বিনিময়ে তা কিনে নেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবার জন্য বড় চুল রাখা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে এবং প্রতি দুই বছর পরপর সেই চুল বিক্রি করার একটা বিধানও চালু করা যেতে পারে। এতে চুল কাটা না-কাটা নিয়ে ঝামেলা যেমন বন্ধ হবে, চুল বিক্রি করে কিছু আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থাও হতে পারে। জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও তা অবদান রাখতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা ভেবে দেখতে পারেন।

লেখক: রম্যরচয়িতা

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © ukbdtv.com
       
themesba-lates1749691102