

ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার ও সাবেক ব্রাজিলিয়ান এক মডেলকে মানবপাচার ও দাসত্বের দায়ে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ক্যাট টরেস নামের ওই নারী তার ওয়েবসাইট ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, ব্যাবসায়িক সাফল্য, আধ্যাত্মিকতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। এসব পরামর্শের নামে নারীদের আকৃষ্ট করে প্রতারণা করতেন টরেজ।
সোমবার (১৫ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রাজিলের দুই তরুণীর নিখোঁজের পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের অনুসন্ধানে ইনফ্লুয়েন্সার ক্যাট টরেসের সংশ্লিষ্টতা পান।
২০১৭ সালে টরেসের ইনস্টাগ্রাম পেজে হঠাৎ চোখ পড়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন অ্যানা নামের এক ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ‘টরেস আমার জন্য একপ্রকার আশার মতো ছিলেন।
যদিও অ্যানা এফবিআইয়ের খোঁজকৃত নারীদের মধ্যে ছিলেন না, তবে তিনিও টরেসের জোর জবরদস্তির শিকার হয়েছিলেন। পরে উদ্ধার অভিযানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

তিনি বলেন, টরেসের ব্রাজিলের দরিদ্র ফ্যাভেলা থেকে আন্তর্জাতিক র্যাম্পে এবং হলিউড তারকাদের সঙ্গে পার্টিতে যাওয়ার ঘটনাগুলো তাকে আকৃষ্ট করেছিল। এছাড়া তিনি লিউনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে পার্টি এবং আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে প্রচ্ছদ করেছিলেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি শৈশবে সহিংসতা, নির্যাতন ও খারাপ কিছু পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে উঠেছেন।
অ্যানা জানান, তিনি নিজেও শৈশবে খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। সে সময় সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন তিনি। টরেসের আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে দক্ষিণ ব্রাজিল থেকে একা যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছিলেন তিনি। তিনি জানতেন না, টরেসের বলা গল্পগুলো অর্ধেক সত্য অর্ধেক মিথ্যার ওপর নির্ভর ছিল।
নিউ ইয়র্কে টরেসের সাবেক ফ্ল্যাটমেট লুজার টোয়ারস্কি বলেন, টরেসের হলিউডের বন্ধুরা তাকে হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ আয়াহুয়াস্কার সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছিলেন।
এ ড্রাগ ব্যবহার করে তিনি নিজেকে লাইফ কোচ ও হিপনোটিস্ট হিসেবে ভাবা শুরু করেছিলেন। এ ছাড়া টরেস সুগার বেবি হিসেবেও কাজ করেছেন বলে বিশ্বাস করেন টোয়ারস্কি। তারা একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ভাড়াও দিতেন ভাগাভাগি করে।
টরেসের স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ও তার ভিডিওগলোতে মানুষকে প্রেম, অর্থ ও আত্ম-সম্মানের প্রতিশ্রুতি দিত। তার ভিডিওগুলোতে স্বাস্থ্য, ব্যাবসায়িক সাফল্য ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হতো। এ ছাড়া তিনি যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য ওয়ান-টু-ওয়ান ভিডিওতে পরামর্শ দিতেন। এর জন্য তিনি অতিরিক্ত ১৫০ ডলার নিতেন।
২০১৯ সালে টরেসের লিভ-ইন সহকারী হিসেবে কাজ করার জন্য নিউ ইয়র্কে আসেন অ্যানা। টরেসের পোষা প্রাণীদের দেখাশোনা, রান্না করা, জামাকাপড় লন্ড্রি ও পরিষ্কারের জন্য মাসে দুই হাজার ডলার পারিশ্রমিক নির্ধারণও করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর অ্যানা হতবাক হয়েছিলেন। তাকে বিড়ালের প্রস্রাব করা সোফায় ঘুমাতে হয়েছিল। জিমে লুকিয়ে ঘুমাতে হতো তাকে। এ ছাড়া তাকে কখনো পারিশ্রমিকও দেওয়া হয়নি।

অ্যানা পালিয়ে যাওয়ার পরে ডিজাইর ও লেটিকা নামে আরো দুই নারীকে নিয়ে আসেন টরেস। তাদের নিয়ে টেক্সাসে চলে যান টরেস। তাদের স্বপ্নও দ্রুত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে যায়। টরেস ডিজাইরকে জাদু করে একটি স্ট্রিপ ক্লাবে কাজ করার জন্য চাপ দেয়। তাদেরকে বাসা থেকে বের হওয়া এবং অন্য নারীদের সঙ্গে কথা বলতেও নিষেধ করেন টরেস।
পরে অবশ্য ডিজাইরকে পতিতাবৃত্তির দিকে যেতে রাজি করিয়েছিলেন টরেস। ডিজাইরকে একটি টার্গেট দিয়ে দিতেন টরেস। পূরণ করতে না পারলে রাস্তায় ঘুমাতে বাধ্য করতেন।
ডিজাইর বলেন, ‘টরেসের দেওয়া টার্গেট পূরণ করতে না পেরে আমি অনেকবার রাস্তায় ঘুমিয়ে ছিলাম।’
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ওই দুই নারীর বন্ধু ও পরিবার তাদের খুঁজে বের করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে শুরু করে। গণমাধ্যমের দৃষ্টি এড়াতে টরেস তাদের নিয়ে মেইন অঙ্গরাজ্যে চলে যান। এরপর তাদের বন্দির কথা অস্বীকার করে এবং অনুসন্ধান বন্ধ করতে ইনস্টাগ্রামে ভিডিও পোস্ট করেন টরেস।
এদের মতো আরো ২০ জন নারী টরেসের প্রতারণার স্বীকার হয়ে নিজেদের কথা জানাতে আসেন। যাদের অনেকের এখনো মানসিক চিকিৎসা চলছে।
নিউজ /এমএসএম